• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪, ০৫:২২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
লিচু’র টক মিষ্টি/ চাষিদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি আবহাওয়া প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে পিকেএসএফ’র সহযোগী সংস্থার সাথে ট্রেড গ্লোবাল লিমিটেড’র সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন কাঁচা কাঁঠালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার হাতছানি বগুড়ায় গাক আয়োজিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ শুরু “নারী উন্নয়নের আলোকবর্তিকা” আক্কেলপুরের বহ্নিশিখা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন কৃষকের দুয়ারে আদনান বাবুর প্ল্যান্টডক্টর মোবাইল টিম করতোয়া নদী বাঁচাতে ১১ পয়েন্ট মানববন্ধন বৃষ্টি চলাকালীন এবং বৃষ্টি পরবর্তী বীজতলায় ধানের চারার যত্ন কৌশল

লিচু’র টক মিষ্টি/ চাষিদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন

প্রতীক ওমর / ৩৭৭ Time View
Update : বুধবার, ৮ জুন, ২০২২

মধুমাস চলছে। হরেক রকম ফলের সুগন্ধ মৌ মৌ করছে চারদিকে। আম কাঁঠাল লিচু জাম জামরুল। নানা ফল। বাংঙ্গালী ফল। এসব ফল নিয়ে উৎসব চলছে। আয়োজন চলছে বাড়ি বাড়ি। পাড়ায় পাড়ায়। যান্ত্রীক শহরও ফলের ছোঁয়ার বাইরে নেই। শুধু খেয়ালে নেই যাদের শ্রমে, ঘামে এসব ফল দিন দিন দানা বেঁধেছে। শক্ত হয়েছে। পরিনত সময়ে আবার নরম হয়েছে, তাদের কথা। বাংলাদেশে এখন বেশ কিছু জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম লিচুসহ ফলের চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলা দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর ও পাবনায় লিচু চাষ হচ্ছে উল্লেখযোগ্যহারে। গেলো কয়েকদিন এই অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকাঘুড়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি লিচু চাষিদের সাথে। তারা সুখ-দুঃখের কথা অকপটে বলেছেন।
সরজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ চাষি পূর্ব পুরুষদের পেশা ধরে রাখতে গিয়ে নানা বৈরীতার শিকার হচ্ছেন। ভরা মৌসুমে দাম পাচ্ছে না কৃষক। রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা। প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নেই দপ্তরগুলোর। পণ্যে রুপান্তরে গবেষণা থাকলেও কৃষি বিপনন এবং সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নীরব ভূমিকায় কৃষকদের কাছে তা পৌছাচ্ছে না। বিশেষায়িত হিমাগার থাকলেও চালু হয়নি। ফলে এক সাথে পেকে যাওয়া লিচু সংরক্ষণের অভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে কৃষকরা।


কথা হয় পাবনার ঈশ^রদী এলাকার ৫৫ বছর বয়সী লিচু চাষি ইয়াছিন আলীর সাথে। তিনি লাঙ্গলকে জানান, বাপ-দাদার দেখে তিনি এই পেশায় এসেছেন। সময়ের ব্যবধানে এই পেশায় ঠিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সার, কিটনাষক, শ্রমিক সব কিছুর দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যয়ের সাথে আয়ের সমন্বয় করা মুশকিল হয়ে উঠেছে এখন। তিনি আরো বলেন, কৃষকরা লিচু উৎপাদনের পর ভালো বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় চাহিদামত দাম পায় না। মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবসায়ীরা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর যদি লিচুর নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নিতো তাহলে কৃষকরা লাভবান হতো।


কৃষকদের অধিকার আদায়, ন্যায্যবাজার নিশ্চিৎ করাসহ কৃষকদের নানা সমস্যার সমাধনে কাজ করে বাংলাদেশ কৃষক উন্নয়ন সোসাইটি। ওই সংগঠনের যুগ্ম-সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা লাঙ্গলকে বলেন, আমরা এই সংগঠনের মাধ্যমে কৃষকদের একত্রিত করার চেষ্টা করছি। তারা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারেন সেই সহযোগিতা আমরা পরস্পরকে দিয়ে থাকি।
তিনি নিজেও একজন লিচু চাষি। পর্ব পুরুষদের শেখানো এই পেশা এখনো তিনি ধরে রেখেছেন। পরিবারের অনেকেই পেশার পরিবর্তন করেছেন বাধ্য হয়েছে। কারণ হিসেবে তিনিও বলেন, কৃষকদের পাশে কেউ নেই। আমরা কৃষকরা মাঠে পরিশ্রম করি, বজ্র্যপাতে মারা যাই। প্রকৃতিক দুর্যোগ, পোকামাকড়ের আক্রমসহ নানা ধকল মারিয়ে ফসল উৎপাদন করতে হয় আমাদের। আর ফসল বিক্রির সময় দাম পাইনা। আমরা ধরেই নিয়েছি এটি কৃষকদের ভাগ্য। আমরা উৎপাদন করবো আর রাতারাতি বড়লোক হবেন কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীরা।
লিচু সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের কোন প্রশিক্ষণ বা বিশেষায়িত সংরক্ষণাগার কৃষি সম্প্রসারণ বা বিপনন বিভাগ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এই দপ্তরগুলো থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাইনা। আমাদের কৃষকদের ফল সংরক্ষণের কোন হিমাগার নেই। দপ্তরগুলোতে যারা বসে আছেন তারা কৃষকদের নিয়ে ভাবেন না। তিনি আরো বলেন, সরকার যদি কৃষকদের উৎপাদিত ফল সরাসরি ভোক্তাদের কাছে বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করে দিতো তাহলে কৃষক এবং ভোক্তা উভয়ই লাভবান হতো।


আমাদের দেশে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়। প্রায় একসাথেই সব বাগানের লিচু পেকে যায়। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় আমদানী বেশি হয়। তখন বাধ্য হয়েই কৃষকদের কমদামে লিচু বিক্রি করতে হয়। লিচু বা অন্য যেকোন দ্রুত পচনশীল ফল সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের হাতে এখনো কোন প্রযুক্তি আসেনি। এনিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলা বরাবরেই লক্ষনীয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে তারা লিচুসহ দ্রুত পচনশীল ফল এবং সবজিকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণের জন্য কয়েক ধরণের পদ্ধতি আবিস্কার করা হয়েছে। এছাড়াও লিচু, আম, কাঠাল থেকে বিভিন্ন পন্য তৈরির প্রযুক্তিও আবিস্কার করা হয়েছে। এগুলো কৃষি সম্প্রসারণ এবং বিপনন অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে পৌছানোর কথা থাকলেও ওই দুই দপ্তরের ভূমিকা হতাশাজনক। কোন বিভাগের সাথে কোন বিভাগের সমন্বয় নেই।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও খাদ্য প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক, (পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ) ড. মো: গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী লাঙ্গলকে জানান, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে আমরা লিচুকে এক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারি এমন প্রযুক্তি আমরা আবিস্কার করতে পেরেছি। এছাড়াও ক্যানিং পদ্ধতিতে লিচু প্রক্রিয়াজাত করে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে ড্রাই ফ্রুটের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব চাহিদার বেশির ভাগ থাইল্যান্ডসহ আরো বেশ কিছু দেশ থেকে আমদানী করছে সুপারসপগুলো। বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয় এসব ড্রাই ফ্রুটে। তিনি মনে করেন আমাদের দেশীয় ফলগুলোকেও পণ্যে রুপান্তর করা সম্ভব এবং চাহিদার জোগান দেয়াও সম্ভব। ফল সংরক্ষণ এবং পণ্যে রুপান্তরের প্রযুক্তিগুলো কৃষক পর্যায়ে পৌছাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাজ হলো গবেষণা করা আর কৃষকদের দোরগোরায় পৌছানোর দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ এবং বিপনন অধিদপ্তরের।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ এবং বিপনন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানেন না এসব পদ্ধতি আবিস্কারের কথা। লিচু সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করণের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত এমন কোন কিছুর আবিস্কার হয়নি। তবে আমরা সংরক্ষণের জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহন করা নিয়ে ভাবছি।


রাজশাহীর পুটিয়া এবং চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে দুটি আলাদা ফল সবজি সংরক্ষণের বিশেষায়িত হিমাগার তৈরি করা হলেও সেগুলো এখনো চালু করা হয়নি। ওই দুটি হিমাগার তৈর সাথে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন প্রস্তুতকরণ শেষ হয়েছে। কিন্তু চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন ওই দুটি কাজ এখনো শেষ হয়নি।
লিচু চাষিদের নানামুখি সমস্যার সমাধান নিয়ে কৃষি বিপনন অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল কোন কার্যকরি পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে কৃষি বিপনন অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালক তাছলিমা খাতুন লাঙ্গলকে বলেন, আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। তাদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছি। তবে কতজন কৃষকদের তারা প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে সেই পরিসংখ্যান তিনি দিতে পারেন নি।

কৃষি, কৃষক সংগঠক ও গবেষক মিজানুর রহমার জুয়েল লাঙ্গলকে বলেন, প্রাচীনকাল থেকে আমাদের জীবন-জীবিকার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে কৃষি। তথ্য প্রযুক্তি এবং সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে এই কৃষি ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। কৃষির বহুমাত্রিক উ’পাদন বিপনন, ব্যবহার নানা ধরণের প্যাটানে পরিবর্তন হয়েছে। সেই জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যারা প্রান্তিক কৃষক তাদের জীবন মানের পরিবর্তন হয়নি। বৃটিশ আমলে জমিদারি প্রথার মাধ্যমে কৃষকদের শোষণ করা হয়েছি। এখন যে সেই কৃষক খুববেশি ভালো আছে তা আমরা বলতে পারছিনা। কৃষি আধুনিকিকরণ করা হলেও সত্যিকার অর্থে এতে কৃষক কতটুকু লাভবান হয়েছে সেটি দেখার বিষয়। তিনি উদাহণ হিসেবে বলেন, কৃষক তার শরীরের ঘাম ঝরিয়ে উ’পাদিত পন্য যদি বাজারে পাঁচটাকা দাম পায় সেই পণ্য শহরে গিয়ে দাম হচ্ছে দশ টাকা। আবার ঢাকায় এসে একই পণ্য বিক্রি হচ্ছে পনেরো টাকায়। এই যে মাঝখানে মধ্যসত্ত্বদের দৌড়াত্ত্ব সেটি বন্ধ করতে হবে অথবা কৃষক এবং মধ্যসত্বভোগীদের লাভের ব্যবধান আরো সীমিত করতে হবে। যাতে মাঝখানে লেনদেনের টাকাগুলো কৃষকের পকেটে যায়। এতে যেমন কৃষক উপকৃত হবে। কৃষকদের জন্য এমন বাজার পরিস্থিতি তৈরিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

উল্লেখ, এবার দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলা দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর ও পাবনায় এই মৌসুমে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category