• সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
লিচু’র টক মিষ্টি/ চাষিদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি আবহাওয়া প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে পিকেএসএফ’র সহযোগী সংস্থার সাথে ট্রেড গ্লোবাল লিমিটেড’র সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন কাঁচা কাঁঠালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার হাতছানি বগুড়ায় গাক আয়োজিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ শুরু “নারী উন্নয়নের আলোকবর্তিকা” আক্কেলপুরের বহ্নিশিখা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন কৃষকের দুয়ারে আদনান বাবুর প্ল্যান্টডক্টর মোবাইল টিম করতোয়া নদী বাঁচাতে ১১ পয়েন্ট মানববন্ধন বৃষ্টি চলাকালীন এবং বৃষ্টি পরবর্তী বীজতলায় ধানের চারার যত্ন কৌশল

“নারী উন্নয়নের আলোকবর্তিকা” আক্কেলপুরের বহ্নিশিখা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩৭৫ Time View
Update : শনিবার, ৫ মার্চ, ২০২২

ফজিলা বানু, জীবন সংগ্রামে প্রায় হেরে যেতেই বসেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ০৩ সন্তান নিয়ে দিশেহারা ফজিলা আশ্রয় নিয়েছিলেন কৃষক বাবার জীর্ণ ভীটায়। তিন বেলা খাবার যোগানোই ছিল ফজিলার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ঠিক এমন গল্প রত্না-স্বপ্না আর ইসমত রাজিয়ারও। আরও মানবেতর অবস্থা সহিদা, ফারজানা, সাবিনা, কহিনুর আর লাভলী বেগমের। তালাকপ্রাপ্তা হয়ে সকলেই অনেকটা লোক চক্ষুর অন্তরালে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে নিচ্ছেন বাবা-ভাই কিংবা নিকট আত্মীয়ের আশ্রয়ে। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এই নারীরা কোনোভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। দারিদ্রতার চেয়েও বড় অভিশাপ যেন সমাজের মানুষদের কটুক্তি আর অবহেলা। হঠাৎ করেই বিধবা-স্বামী পরিত্যাক্তা এই অসহায় নারীদের জীবনে ঘটে গেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে বহ্নিশিখা দুঃস্থ মহিলা সমবায় সমিতির অফিস কক্ষে গিয়ে দেখা গেল ১০ থেকে ১২ জন নারী রয়েছেন মাছ ধরার জাল বানানোর কাজে। পাশেই ভূমি অফিসের পুকুরে দেখা গেল আরো চমকপ্রদ দৃশ্য! কয়েকজন নারী নেমে পড়েছেন পুকুরে মাছের খাদ্য বিতরণে, কয়েকজন নিবিষ্টমনে পুকুরপাড়ের সবজি বাগানের মাচায় রশি বাধছেন। পাশেই চোখে পড়ল একটি ভার্মিকম্পোস্ট ইউনিট। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে আরো অনেক চমকপ্রদ ও ভীষন আশাব্যঞ্জক তথ্য দিলেন বহ্নিশিখা সমিতির এই নারীরা। সরেজমিনে জানা গেল ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ২৫ জন দরিদ্র অসহায় দুস্থ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে বহ্নি শিখা দুঃস্থ মহিলা সমবায় সমিতি লিঃ। উপজেলা নির্বাহি অফিসার জনাব এস এম হাবিবুল হাসান শোনালেন এই আলোকযাত্রার পেছনের কথা। শুধুমাত্র পটভূমিই নয় বরং অত্যন্ত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা শোনালেন সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জনাব মোঃ মহিদুল ইসলাম। উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে পরিবর্তনের কাজটি বাস্তবায়ন করছে উপজেলা মৎস্য দপ্তর। উপজেলা সমবায় দপ্তর, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন দপ্তর, উপজেলা যুব উন্নয়ন দপ্তর, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর, উপজেলা স্বাস্থ্য দপ্তর ও মহিলা বিষয়ক দপ্তর প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করছে এই ২৫ জন নারীর ভাগ্য উন্নয়নের কাজে।  উপজেলা নির্বাহি অফিসার ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানালেন তাদের এই উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ।

আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের উপজেলা পরিসংখ্যান দপ্তরের সহযোগিতায় একটি কাঠামোগত জরিপ পরিচালনা করে পিতা, ভাই কিংবা অন্য কোন আত্মীয়র আশ্রয়ে আশ্রিত স্বামী পরিত্যাক্তা বিধবা নারীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। প্রস্তুতকৃত তালিকা হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, আর্থিক ও সামাজিক দৈন্যতার মাপকাঠিতে ৭০ জন নারীকে বাছাই করা হয়।

বাছাইকৃত নারীদের প্রকৃত অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ ও অধিকতর সমস্যাগ্রস্ত নারীদেরকে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে “তথ্য আপাঃ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রকল্প” এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক দপ্তর এর সহায়তায় গোপীনাথপুর ইউনিয়নের মোট ৪ টি উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়। উঠান বৈঠক শেষে ৭০ জনের মধ্য হতে ২৫ জনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে তালিকা গঠন করা হয়। তালিকাভুক্ত বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদেরকে সমন্বয় করে উপজেলা সমবায় দপ্তর এর মাধ্যমে “বহ্নিশিখা- দুস্থ মহিলা সমবায় সমিতি লিঃ” গঠন করা হয়।

সমিতিভুক্ত নারীদেরকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় এর সমন্বয়ে ও নির্দেশনায় উপজেলা মৎস্য দপ্তর, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন দপ্তর, উপজেলা যুব উন্নয়ন দপ্তর, উপজেলা সমবায় দপ্তর, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক দপ্তর এর মাধ্যমে বিশেষ আত্মকর্মসংস্থানমূলক মোট ১৫ টি প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা হয়।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমিতিভুক্ত নারীদেরকে কয়েকটি অভ্যন্তরীণ গ্রুপে ভাগ করা হয়। একটি গ্রুপকে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন দপ্তরের মাধ্যমে ৫০,০০০/- টাকা ঋণ প্রদান করা হয়, ০২ জন নারীকে বাছাই করে উপজেলা যুব উন্নয়ন দপ্তরের মাধ্যমে প্রত্যেককে ২৫,০০০/- হাজার টাকা করে যুব ঋণ প্রদান করা হয়। উপজেলা জলমহাল কমিটির বিশেষ সভার মাধ্যমে গোপীনাথপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ৫৬ শতাংশ আয়তন বিশিষ্ট একটি পুকুর সমিতির নামে ০৩ বছরের জন্য ইজারা প্রদান করা হয়। ইজারাকৃত পুকুরটি উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংস্কার করে বিশেষ ভাবে চাষযোগ্য করা হয়। পুকুরে GAP (Good Aquaculture Practice) অনুসৃত মডেলে নিরাপদ মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে উন্নত পোনা, মাছের খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা হয়।

 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর এর মাধ্যমে পুকুরপাড়ে পেঁপে বাগান, শীতকালীন সবজি এবং একটি ভার্মিকম্পোস্ট ইউনিট স্থাপন করা হয়। সমিতির সদস্যের মধ্যে ১২ জন সদস্যকে ১২ টি মাছ ধরার খেপলা জাল (Cast Net) বানানোর সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। সদস্যগণ অত্যন্ত সফলভাবে বারটি খেপলা জাল প্রস্তুত করে বাজারজাত করেন। সমিতির ০৫ জন সদস্যকে বসতবাড়িতে লালন-পালন করার জন্য ০৫ টি ভেড়া প্রদান করা হয়। সমিতির ০৩ জন সদস্যের বাড়ির উঠানে কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর এর সহায়তায় ০৩ টি পারিবারিক পুষ্টির বাগান তৈরি করা হয়। সমিতির ২৫ জন সদস্য ও তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর ব্যবস্থাপনায় প্রতি মাসে একটি করে হেল্থ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কর্মীদের সাথে সদস্যগণকে বিশেষভাবে সংযোগ করে দেওয়া হয়।

সমিতির সদস্য গনের উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং পণ্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবে বিক্রয়ের পাশাপাশি অনলাইনে বিপননের লক্ষ্যে “বহ্নিশিখা-আক্কেলপুর” নামক একটি ফেসবুক পেইজ খোলা হয়েছে। সমিতির সকল আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার লক্ষে রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, গোপীনাথপুর, আক্কেলপুরে একটি হিসাব খোলা হয়েছে। সদস্যগণের মাসিক সঞ্চয় ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়লব্ধ অর্থ সমিতির ব্যাংক হিসেবে জমা করা হয়।

নিয়মিতভাবে আয়োজিত সমিতির মাসিক সভায় উপজেলা নির্বাহি অফিসার মনোনীত কর্মকর্তাকে সমন্বয়ের নির্দেশনা দেয়া হয়। মাসিক সভার সিদ্ধান্ত সমূহের একটি সারসংক্ষেপ উপজেলা পরিষদ সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করা হয়।

জনবান্ধব উন্নয়ন রুপকার বর্তমান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সেবাকে একীভূত করে সমাজের একটি বিশেষ শ্রেনীর অবহেলিত নারী গোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নের এই উদ্যোগটি সারা দেশে বাস্তবায়ন করলে তা হবে দেশের নারী উন্নয়নের একটি বৈপ্লবিক মডেল। আমরা এই ধরনের টেকসই, বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও সৃজনশীল সমন্বিত সেবা ব্যবস্থাপনার সফলতা ও মঙ্গল কামনা করছি।

 

 

 

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category