• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪, ০৬:২৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
লিচু’র টক মিষ্টি/ চাষিদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি আবহাওয়া প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে পিকেএসএফ’র সহযোগী সংস্থার সাথে ট্রেড গ্লোবাল লিমিটেড’র সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন কাঁচা কাঁঠালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার হাতছানি বগুড়ায় গাক আয়োজিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ শুরু “নারী উন্নয়নের আলোকবর্তিকা” আক্কেলপুরের বহ্নিশিখা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন কৃষকের দুয়ারে আদনান বাবুর প্ল্যান্টডক্টর মোবাইল টিম করতোয়া নদী বাঁচাতে ১১ পয়েন্ট মানববন্ধন বৃষ্টি চলাকালীন এবং বৃষ্টি পরবর্তী বীজতলায় ধানের চারার যত্ন কৌশল

‘মানুষের কল্যাণে গবেষণা চালিয়ে যেতে  চাই’- ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম

Reporter Name / ৩৭৪ Time View
Update : রবিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২১
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এর মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম তার দপ্তরে লাঙ্গল সম্পাদক এর কাছে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। ছবি: ফখরুল ইসলা।

প্রতীক ওমর:

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এর মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম এ পর্যন্ত ধানের ৯টি জাতসহ অন্যান্য ফসলের মোট ২৫টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হলো লবণাক্ততা সহিষ্ণু ২টি জাত বিনাধান-৮ ও বিনাধান-১০, জলমগ্নতা সহিষ্ণু ২টি জাত বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ যা যথাক্রমে উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা ও বন্যা কবলিত এলাকায় কৃষকদের মাঝে আশার আলো জাগিয়েছে। এছাড়াও সার ও পানি সাশ্রয়ী উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত বিনাধান-১৭ আমন মৌসুমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তিনি ২০১৮ সনে আফ্রিকার নেরিকা হতে রেডিয়েশনের মাধ্যমে আউশ মৌসুম উপযোগী বিনাধান-২১ উদ্ভাবন করেন। লাঙ্গলের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে ধান নিয়ে তাঁর গবেষণা কর্যক্রমগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লাঙ্গল সম্পাদক প্রতীক ওমর।

শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ীতে বিনাধান-১১ এর ফসল কর্তন ও মাঠদিবস অনুষ্ঠানে বিনা’র মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম।

লাঙ্গল: কবে থেকে ধান নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন?
ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম: আমার পিতা মির্জা শামসুল আলম ছিলেন একজন প্রগতিশীল ব্যক্তি। রাজনীতি না করলেও সমাজসেবায় নিজেকে সব সময় নিয়োজিত রাখতেন। মানুষের জন্য জীবনের সময়গুলো বিলিয়ে দিয়েছেন। তার এই মানুষসেবা কাছে থেকে দেখে নিজের মধ্যেও এমন প্রেরণা জন্মনেয় ছোটবেলায়। পরে কৃষিতে পড়াশোনা শেষে করেই গবেষণা শুরু করি। মানুষের কল্যাণে কাজে আসবে এমন চিন্তা মাথায় রেখেই কৃষিতে আমার এই মনোনীবেশ।

লাঙ্গল: কৃষিতে আপনার উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনগুলো কিকি?
ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম: এ পর্যন্ত ধানের ৯টি জাতসহ অন্যান্য ফসলের মোট ২৫ টি উন্নত জাত আমি উদ্ভাবন করেছি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হলো লবণাক্ততা সহিষ্ণু ২টি জাত বিনাধান-৮ ও বিনাধান-১০, জলমগ্নতা সহিষ্ণু ২টি জাত বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ যা যথাক্রমে উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা ও বন্যা কবলিত এলাকায় কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করছে। এছাড়াও সার ও পানি সাশ্রয়ী উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত বিনাধান-১৭ আমন মৌসুমে চাষের জন্য উপযুক্ত। ২০১৮ সনে আফ্রিকার নেরিকা হতে রেডিয়েশনের মাধ্যমে আউশ মৌসুম উপযোগী বিনাধান-২১ আমার হাতেই উদ্ভাবন করা। সম্প্রতি লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু আমন ধান বিনাধান-২৩ সফলভাবে উদ্ভাবন করেছি।

 

রংপুরে বিনাধান-১৭ জাতের চাষি তার ক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছেন।

লাঙ্গল: লবণাক্ততা সহিষ্ণু এবং জলমগ্নতা সহিষ্ণু জাতের ধানের আলাদা বৈশিষ্ট্য কি? এসব ধান চাষে কৃষকরা কি ভাবে লাভবান হবে?
ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, লক্ষিপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ ১৯টি জেলা লবনাক্ত এলাকা। এসব এলাকার প্রায় দশ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। লবনাক্ত এসব পতিত জমিতে কি ভাবে ধান চাষ করা যায় এনিয়ে গবেষণা করে আমি ২০১০ সালে প্রথম লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত বিনা ধান-৮ আবিস্কার করি। এই জাতটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু। ফলে এসব অঞ্চলের কৃষকরা এখন দিব্যি চাষ করতে পারছেন। এসব এলাকায় এখন আর কোন জমি পতিত নেই। পরে লবণাক্ততা সহিষ্ণু বিনাধান-১০ আবিস্কার করি। এটির ফলন আরো। দক্ষিণলাঞ্চলে এখন যত ধানের চাষ হচ্ছে তার প্রায় ৪০ শতাংশ বিনা-১০ জাতের ধান কৃষকরা চাষ করছেন। আমাদের কাছে পরিসংখ্যান আছে, দক্ষিণাঞ্চলের পতিত জমিগুলো শতভাগ চাষের আওতায় আনতে পারলে প্রতি মৌসুমে অতিক্তি ৩০ থেকে ৪০ লাখ মে.টন চাল অরিক্তি উৎপাদন করা সম্ভব এই জাতের ধান থেকে।
অপর দিকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বড় একটি এলাকা বন্যাকবিত হিসেবে পরিচিত। বন্যায় এই অঞ্চলের কৃষকদের ব্যপক ক্ষতিসাধণ হয়ে থাকে। আমি ওই অঞ্চলের জন্য বিনাধান-১১ এবং ১২ আবিস্কার করেছি। এই জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি জলমগ্নতা সহিষ্ণু জাত। বন্যায় ২০-২৫ দিন পানির নিচে তালিয়ে থাকলেও কোন ক্ষতি হয় না। বন্যা নেমে যাওয়ার সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে নতুন কুশিতে আবারও জমি ভরে ওঠে। নতুন করে কৃষকদের কোন খরচ করতে হয় না। এই জাতের ধানগুলো বর্তমানে কৃষকদের মঝে বেশ প্রিয় হয়ে উঠছে। চাষ বৃদ্ধি নিশ্চিৎ হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবদিগন্তের সূচনা হবে বলে আমি মনে করি।

 

ময়মনসিংহের পরানগঞ্জের কৃষকদের বিনাজাতের ধান চাষে পরামর্শ দিচ্ছেন ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম।

লাঙ্গল: বিনা জাতের ধান ঘরে তুলতে কতদিন সময় লাগে?
ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম: বাংলাদেশের কৃষকরা একটি জমিতে বছরে দুটি ফসলের বেশি চাষ করতে পরতো না। বন্যা এলাকা বা খাল বিল এলাকায় বছরে একটি ফসল চাষ হতো। কিন্তু বিনাজাতের ধানগুলো আবিস্কারের ফলে কৃষকরা এখন বছরে ৩টি পর্যন্ত ফসল ঘরে তুলতে পারছেন। স্থানীয় জাতের আমন ধানের জীবনকাল ১৬০-১৭০ দিন এবং গাছ লম্বা হওয়ায় ঢলে পড়ে। দীর্ঘ জীবনকাল বিশিষ্ট হওয়ায় দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের কৃষকরা বছরে দু’টির বেশি ফসল চাষ করতে পারে না। তাই গবেষণার মাধ্যমে আমন মৌসুমের জন্য উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট বিনাধান-১১, ১৬ ও ১৭ ধানের জাত আবিষ্কার করেছি। বিনাধান-১১, ১৬ ও ১৭ এর জীবনকাল বীজতলা থেকে ১০০-১১০ দিন এবং গড় ফলনও ৬.৫টন/হেক্টর (বিঘা প্রতি ২৭ মণ)।
বিনাধান কাটার পর বিনা সরিষা-৯ চাষ করে দুই ফসলি জমিতে তিনটি ফসল অনায়াসে ঘরে তোলা যায়। এই ধানটি রোগ বালাই সহনশীল, এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া সার ও অর্ধেক পানি সাশ্রয়ী এবং খরা সহিষ্ণু হওয়ায় আগাম ও অধিক ফলনশীল বিনাধান-১৭ কে ‘গ্রিন সুপার রাইস’ বলা হয়।

লাঙ্গল: ধান নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম: ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সবার আগে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করতে হবে। সফল ফলে বাংলাদেশের কৃষক কি ভাবে বেশি লাভবান হতে পাবরে সেই চিন্তাই আমি সব সময় করি। কৃষকদের কথা মাথায় রেখে আমি আমার গবেষণাকে অনেক দূর নিয়ে যেতে চাই। আমার এই গবেষণার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য অনুজদের উচ্চতর ট্রেণিংয়ে দেশের বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে যেন বাংলাদেশের কৃষিতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এর মূল ভবন, ময়মনসিংহ। ছবি: ফখরুল ইসলাম।

উল্লেখ্য, ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর আবেদনে কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতিষ্ঠানের বায়োটেকনোলজি বিভাগকে “বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কার-১৪১৮” এ রৌপ্য পদক প্রদান করা হয়। কৃষি গবেষণায় বিরল সফলতার জন্য তিনি ২০১৪ সনে জাতিসংঘের  FAO-IAEA  এর  Outstanding Achievement Award -2014″ লাভ করেন এবং কৃষি মন্ত্রণালয় তাঁকে ২০১৪ সনে সম্বর্ধনা প্রদান করে।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এর মহাপরিচালকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা  (IAEA)  ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষেণা ইনস্টিটিউট  (IRRI) এর অর্থায়নে পরিচালিত কারিগরী সহায়তা প্রকল্প ও  Stress Tolernt Rice for Africa and South Asia (STRASA) প্রকল্পের প্রধান গবেষক হিসেবে গবেষণা কাজ পরিচালনা করছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণা কর্মসূচীর কর্মসূচী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন (২০১২-২০১৫)। তিনি ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ৩৬টি প্রকল্পের গবেষণা কাজ সফলতার সাথে সমাপ্ত করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category